সভ্যতার অগ্রযাত্রায় প্রকৃতির স্বকীয়তায় মানবসম্প্রদায় কখনো মুখোমুখি হয়েছে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়,বন্যা,জলচ্ছাস কখনো ভয়ংকর মহামারীর।কখনো বা আকাশ থেকে উল্কাপাত করে পুরো জনপদ ধ্বংস করে অবাধ্য মানুষকে শাসন করেছে বহুবার। তবে এই থেকে শিক্ষা নিয়েছে মানব সম্প্রদায়?

কথায় আছে স্বভাব যায় না মলে। এই দূর্যোগকে উল্টো করেছে শাসন শোষণ এর হাতিয়ার। চীন জাপান যুদ্ধের কথায় ধরা যাক। ১৩২০ থেকে শুরু হওয়া প্লেগ মহামারীতে জনজীবন পন্ড। রোগের কারণ বুঝতে না পারায় চিকিৎসার অভাবে পৃথিবীর কিছু বিশেষ অঞ্চলের অবস্থা এমন হয়ে ছিল যে সেখানে লাশ দাফন করার জন্য মানুষ শুকনো জমি না পেয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে এসে তাদের পরিজনের লাশ ভাসিয়ে দিয়েছিল। আর এমন মানবেতর দিন গুলোতে জাপান প্লেগ আক্রান্ত মৃতদেহ গুলো শত্রু রাষ্ট্রগুলোতে মহামারী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিক্ষেপ করত। এর সাথে সম্পৃক্ত ছিল জাপান এর রাজকীয় সৈন্যবাহিনী, মাইক্রোবায়োলজিস্ট শিরো ইশিয় ও “ইউনিক ৭৩১”। এমনকি যদ্ধ ক্ষেত্রে ব্যাবহারের আগে মানব শরীরে চালানো হয়েছিল পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। যার কারণে প্লেগকে আজ গণ্য করা হয় বায়োলজিকাল যুদ্ধের প্রাথমিক অস্ত্র হিসেবে।

যেহেতু এই রোগ উপমক্ষিকা ও ইদুর দ্বারা ছড়াত তা জানা ছিল না তাই জনমনে একটি ভিতি সৃষ্টি হয়।তাই অনেক অঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী নিম্নশ্রেণীর লোকেদের বলি দিত উচ্চবর্গের লোকেদের সাহস যোগাতে। সে সময় প্লেগকে গন্য করা হতো “pestis manufacta”

বা শয়তানের রোগ।

বিশ্ব ১৩২০-১৯২০ জুড়ে প্লেগের আবির্ভাব ছিল। এসময়ে বিশ্বজুড়ে প্লেগের প্রভাবে যত সংখ্যক মানুষ মারা যায় তা পুনরুদ্ধার হতে সময় লেগেছিল গোটা দুটি শতক। তবে জনসংখ্যার ঘাটতি ইউরোপের জন্য আশির্বাদ হয়ে উঠে। অল্প জনসংখ্যার জন্য খাদ্য,চিকিৎসা, নিরাপাত্তা, শিক্ষাসহ অন্যান মৌলিক চাহিদা পূরণ করা শাসকদের জন্য সহজসাধ্য হয়ে উঠে। ফলে বাড়তে থাকে জীবন মান। আবার অল্প জনসংখ্যার ফলে বিলুপ্ত হয়েছিল জমিদারি প্রথা, ফিউডালিজম। সংগঠিত হয়েছিল কৃষিবিল্পব, শিল্পবিপ্লব সহ আরো বেশ কিছু বিপ্লব। এভাবে ইউরোপে রেনেসাঁ ঘটেছিল। যার পরবর্তী ইতিহাস কারোরই অজানা নয়। তবে প্লেগ পরবর্তী সময়ে রেনেসাঁ বা বিপ্লব ঘটলেও এর আগে ইউরোপজুড়ে ছিল অজস্র বিশৃঙ্খলা, দুর্দশা, শোষণ, দুর্ভক্ষ যার মাশুল গুনতে হয়েছিল তৎকালীন দু থেকে তিনটি প্রজন্মকে।

তবে দীর্ঘ এই সময় ধরে চলা মহামারী দূর্যোগে কি সভ্যতার অগ্র যাত্রা থমকে ছিল? না। এই অস্থির দিনেও ছিল অনেক স্বস্তির গল্প।

১৫৬৪ সালে প্লেগ আবার ফিরে আসলে সেবার মৃতের সংখ্যা হয় আগেরবারের মৃতের সংখ্যার ৪ গুণ। ইউরোপে আক্রান্ত হয় প্রতি ৩ জনের ১ জন। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল ৬০% এবং চিকিৎসা স্বত্তেও মারা যায় ১০% মানুষ। লন্ডনের প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা হ্রাস পায়। এসময় জন্মগ্রহণ করেন কিংবদন্তি উইলিয়াম  শেক্সপিয়ার। তার পর থেকেই ঘন ঘন মহামারীর কবলে পরেন তিনি। জীবনদশায় কখনো ৬ মাস কখনো বা টানা আড়াই বছর কাটিয়েছেন ঘর বন্দী অবস্থায়।১৬০৩ সালে প্লেগ আবার হানা দিলে সেবার লন্ডনের প্রতি ৫ জনের একজন মৃত্যুবরণ করে। সে সময় শেক্সপিয়ার লিখে ফেললেন “মেজার ফর মেজার”। সে সময় লন্ডনের রঙমঞ্চগুলো যতদিন না খোলা ছিল তার চেয়ে বেশী সময় ধরে ছিল বন্ধ। তার অমর সৃষ্টির তিনটি গ্রন্থ “মেকব্যাথ”,” কিং লেয়ার”,”এনথনি এন্ড ক্লিওপেট্রা” লিখেছেন এই অবাধ্য সময়ে ঘরবন্দী অবস্থায়। এমনকি তার জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ভেনাস এন্ড এডোনিস” (১৫৯৩) লিখেছেন কোয়ারেন্টাইন দশায়। ধারণা করা হয় “ওথেলো” ও লিখেছিলেন বন্দী দশায় কারণ তা প্রকাশ পায় ১৬০৪ সালে। বন্দি দশায় শেক্সপিয়ার প্রিয়জন হারানোর শোক ও বরণ করেছেন তবে তিনি কখনো প্লেগ আক্রান্ত হন নি। তবে শেক্সপিয়ার এর হাতের লিখা ছিল এলোমেলো তাই আজো অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন সেসময় শেক্সপিয়ার সিফিলিসে আক্রান্ত ছিলেন।

১৬৬৫ সেবার প্রায় আঠারো মাস বন্ধ ছিল ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ২৩ বছর বয়সী নিউটন ছিল সেসময়কার ক্যামব্রিজ এর ছাত্র। তখন প্লেগ আবার মহামারী রূপ ধারণ করলে নিউটনকে পাড়ি জমাতে হয়েছিল দীর্ঘ ৬০ মাইল দূরে নিজ নিবাসে এবং প্রায় ২২ মাস ছিলেন কোয়ারেন্টাইনে। কিন্তু হেলায় কাটেনি তার বন্দী দশা। তার শোয়ার ঘরের জানালার সুরু ফুটো দিয়ে প্রবেশ করত আলো একদিন সেই ছিদ্র পথে ধরল একটি প্রিজম। বর্তমানের প্রিজম এর আলোক বিচ্ছুরণ তত্ত্ব সেসময়কার এর আবিষ্কার৷ জনপ্রিয় ব্যান্ড পিঙ্ক ফ্লয়েড তাদের একটি কাভার ফটো হিসেবে ব্যাবহার করে এই চিত্র। নিউটন এর ঘর থেকে দেখা যেত একটি আপেল বাগান। আপেল বাগানে চিন্তাশীল অবস্তায় আপেলের ভূমিতে পরার কারণ বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করলেন মধ্যাকর্ষন তত্ত্ব। যদিও সে তত্ত্ব তিনি প্রকাশ করেছিলেন তারও বিশ বছর পর। ক্যালকুলাস এর অনেক জটিল বিষয়ের সুরহাও করেছিলেন তিনি ঐ অবস্থায়।

শুধু শেক্সপিয়ার কিংবা নিউটন নন আরো অনেক জ্ঞানীগুনীজনরা ও অবাধ্য এই সময়ে সৃষ্টি কতে গেছেন তাদের অনন্য কৃর্তি। অ্যাডভার্ড মুনচ,থমাস নাসে, কারাভাজ্জো নামে জগতখ্যাত শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলো মেরিসরাই আরো অনেকে তার জলন্ত উদাহরণ।

তবে সকলেই যে আরাম আয়েশে থেকে সুস্থ অবস্থায় জ্ঞান চর্চা করেছেন তা কিন্তু নয়। ১৩৪৮  সালে বিখ্যাত ইতালিয়ান কবি ও ফ্লোরেন্টাইন লেখক জিওভান্নি বোকাচিও নিজে আক্রান্ত হয়ে পড়ে প্লেগে। তার বাবা ও সৎমা ও আক্রান্ত হয় এই রোগে। সেসময় পল্লী জীবনে ঘর বন্দী থেকে লিখেছেন “দ্যা ডেকামেরন” যা পরবর্তী সময়ে শেক্সপিয়ারকে অনুপ্রাণিত করেছিল “মার্চেন্ট অব ভেনিস” লেখায়।

সুইজারল্যান্ড বেড়াতে গিয়ে ঘরবন্দী অবস্থায় গ্রহণ করেছিল ভুতের গল্প লিখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ছিলেন মেরী শেলী।এরপর তীব্র শ্বাসকষ্ট ও কৃত্রিম শ্বাস ব্যাবস্থা নিয়ে শেষ পর্যন্ত লিখেছেন “ফ্রাঙ্কেস্টাইন” যা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সৃষ্টি ও বজ্রপাতের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চার করা এক বিভৎস দানবের লোমহর্ষক ও রোমাঞ্চকর কাহিনীতে সাজনো এক উপন্যাস। যার উপর ভিত্তি করে বর্তমান সময়ে নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচিত্র।

 

বর্তমান সময়ে মহামারীরূপে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে বিপর্যয়ে গোটা বিশ্ব। থমকে আছে মানুষের পথচলা কিন্তু থমকে নেয় মানুষের অগ্রযাত্রা। আলবেয়ার ক্যামু তার বিখ্যাত “দ্যা প্লেগ” গ্রন্থে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া মানুষের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। পবিত্র কোরানের বলা আছে ধৈর্য ধারণ এর কথা। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও দিয়েছেন নানা দিক নির্দেশনা।  ঘরবন্দী অবস্থায় জীবন কাটছে সকলের।কিন্তু থেমে থাকলে চলবে না এগিয়ে যেতে হবে এই অবাধ্য সময়ের মাঝে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে,হতাশা কাটিয়ে।কারণ খারাপ সময়েরও একটা মূল্য আছে। খারাপ সময়ই মূল্যায়ন করতে শিখায় আমাদের জীবনের ভাল দিক গুলো।