একলব্য কবিতা- কালিদাস রায়

একলব্য

কালিদাস রায়

হে অনার্য্য, একদিন গুরুকুলে পাওনিক স্থান,
যুগে যুগে তাই তুমি আর্য্যদম্ভে কর লজ্জা দান।
নিঃস্ব বনবাসী তুমি মহাসত্য-ধনের ভাণ্ডারী,
যাহারা সর্ব্বগ্রাসী তাহারাই এ বিশ্বে ভিখারী।
চাহনিক রাজছত্র, দিগ্বিজয়, রত্নের ভাণ্ডার,
সত্যের প্রতিষ্ঠা করি সমাপিত সাধনা তোমার।
দেখায়েছ কভু নহে একনিষ্ঠ সাধনা বিফল,
শোণিতে বুদ্বুদসম জনমে না তপস্যার বল।
কাম্য কিছু নাহি তব যোগ্যতারই করেছ প্রমাণ,
মহাভারতের পীঠে দর্ভাসনে লভিয়াছ স্থান।

শক্তি সে ব্রহ্মময়ী, ত্যাগ সে যে পরমার্থময়,
আর্য্যের নাহিক লজ্জা তার কাছে লভি পরাজয়।
সত্য চির হোক প্রিয়, মিথ্যা হোক চির তিরস্কৃত,
মহাভারতের কথা তাই গেয়ে হইল অমৃত।

বিশ্বব্যাপী জ্ঞান-ব্রহ্ম, অংশ তার প্রজ্ঞাবীজময়
কানন-কান্তার-গিরি যথা রোক্ হবে অভ্যুদয়
সৃষ্টির বিধান-সূত্রে। কে রোধিবে তাহার উন্মেষ?
অক্ষয় জীবনধর্ম্ম, কি করিবে অসূয়া-বিদ্বেষ?
কে পারে রোধিতে বিশ্বে পঙ্কমাঝে পঙ্কজবিকাশ,
খনির তিমির গর্ভে অঙ্গারকে মণির নিবাস?

যে শক্তি ছুটিবে বিশ্বে ব্যোমমার্গে পুষ্পকের রথে
কে রাখিবে তারে বাঁধি দ্বিজত্বের বাঁধা রাজপথে?
জহ্নবী চলিবে ছুটি অবিচারে গিরি বনে মাঠে,
কে তারে রোধিতে পারে বারাণসী-প্রয়াগের ঘাটে?
মানব-সমুদ্র মাঝে কে করিবে শাশ্বত বিভাগ
বাঁধ বাঁধি? বিরাটের অঙ্গে অঙ্গে কে কাটিবে দাগ?
যে শক্তি নিহিত মূলে কেমনে তা করিবে উচ্ছেদ
শাখার ছেদনে বলো? অখণ্ড সেই মূলে কই ভেদ?
যেখানে জীবাত্মা রাজে সেইখানে শিবত্ব বিরাজে,
শিবত্ব আবদ্ধ নহে আভিজাত্য-পাষাণের মাঝে।

দীক্ষার দক্ষিণা ছলে করিয়াছ সর্ব্বস্ব প্রদান,
এর কাছে অশ্বমেধ বিশ্বজিৎ হয়ে যায় ম্লান!
লক্ষ গুণ প্রতিশোধ, হে বীরেন্দ্র, দিয়াছ ঘৃণার,
অক্লেশে বর্জ্জিয়া বর চিরার্জ্জিত জীবনের সার।
আর্য্য সে করুক গর্ব্ব দন্তে কাটি অঙ্গুলিটি তব,
অনার্য্য নিষাদ, তবু তোমারেই আর্য্য মোরা ক’বো।
জাগো তুমি হে নিষাদ, ভারতের গুরুকুলমাঝে
পশু-মাংস-পুষ্ট দেহে রক্তসিক্ত কৃষ্ণাজিন সাজে।
জ্বলন্ত সত্যের মূর্ত্তি—আগে আগে চল ত্যাগ-বীর,
নত হোক পদে যত রক্তগর্ব্বী ভ্রান্তজন-শির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10-5=? ( 5 )