কলিকাতা কোথায় রে কবিতা – সুকুমার রায়

কলিকাতা কোথা রে

সুকুমার রায়

গিরিধি আরামপুরী, দেহ মন চিৎপাত,
খেয়ে শুয়ে হু হু করে কেটে যায় দিনরাত
হৈ চৈ হাঙ্গামা হুড়োতাড়া হেথা নাই
মাস বার তারিখের কোন কিছু ল্যাঠা নেই
খিদে পেলে তেড়ে খাও, ঘুম পেলে ঘুমিও-
মোট কথা, কি আরাম, বুঝলে না তুমিও !
ভুলেই গেছিনু কোথা এই ধরা মাঝেতে
আছে যে শহর এক কলকাতা নামেতে-
হেন কালে চেয়ে দেখি চিঠি এক সমুখে,
চায়েতে অমুক দিন ভোজ দেয় অমুকে ।
‘কোথায়? কোথায়?’ বলে মন ওঠে লাফিয়ে
তাড়াতাড়ি চিঠিখানা তেড়ে ধরি চাপিয়ে,
ঠিকানাটা চেয়ে দেখি নীচু পানে ওধারে
লেখা আছে ‘কলিকাতা’ – সে আবার কোথারে!
স্মৃতি কয় ‘কলিকাতা’ রোস দেখি; তাই ত,
কোথায় শুনেছি যেন, মনে ঠিক নাই ত,
বেগতিক শুধালেম সাধুরাম ধোপারে
সে কহিল, হলে হবে উশ্রীর ওপারে।
ওপারের জেলেবুড়ো মাথা নেড়ে কয় সে,
‘হেন নাম শুনি নাই আমার এ বয়সে।’
তারপরে পুছিলাম সরকারী মজুরে
তামাম মুলুক সে ত বাৎলায়’হুজুরে’
বেঙাবাদ বরাকর , ইদিকে পচম্বা,
উদিকে পরেশনাথ ,পাড়ি দাও লম্বা
সব তার সড়গড় নেই কোন ভুল তায়-
‘কুলিকাতা কাঁহা’ বলি সেও মাথা চুলকায় !
অবশেষে নিরুপায় মাথা যায় ঘুলিয়ে’
‘টাইম টেবিল’ খুলি দেখি চোখ বুলয়ে ।
সেথায় পাটনা পুরী গয়া গোমো মাল্দ
বজবজ দমদম হাওড়া ও শ্যালদ-
ইত্যাদি কত নাম চেয়ে দেখি সামনেই
তার মাঝে কোন খানে কলিকাতা নাম নেই !!
-সব ফাঁকি বুজ্রুকী রসিকতা -চেষ্টা!
উদ্দেশে ‘শালা ‘ বলি গাল দিনু শেষটা।-
সহসা স্মৃতিতে যেন লাগিল কি ফুৎকার
উদিল কুমড়া হেন চাঁদপানা মুখ কার!
আশে পাশে ঢিপি ঢুপি পাহাড়ে পুঞ্জ,
মুখ চাঁচা ময়দান, মাঝে কিবা কুঞ্জ!
সে শোভা স্মরণে ঝরে নয়নের ঝরনা
গৃহিনীরে কহি ‘প্রিয়ে !মারা যাই ধর না।
তার পরে দেখি ঘরে অতি ঘোর অনাচার-
রাখে না কো কেউ কোন তারিখের সমাচার!
তখনি আনিয়া পাঁজি দেখা গেল গণিয়া,
চায়ের সময় এল একেবারে ঘনিয়া!
হায়রে সময় নেই, মন কাদে হতাশে-
কোথায় চায়ের মেলা! মুখশশী কোথা সে!
স্বপন শূকায়ে যায় আধারিয়া নয়নে,
কবিতায় গলি তাই গাহি শোক শয়নে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10-5=? ( 5 )