কৃষানির ব্যাথা কবিতা- কালিদাস রায়

কৃষানির ব্যাথা

কালিদাস রায়

সুখের এ ঘর গড়িয়া তুলিয়া বুকের রক্ত দিয়া,
আজ কোথা তুমি চলে গেলে হায় সংসার আঁধারিয়া?
ধানে ধানে আজ উঠোন ভরেছে, ঠাঁইটুকু নাই আর,
মঙ্গলা আজি ঢালিতেছে দুধ বাছুর হয়েছে তার।
মাচান ছাপিয়ে লাউলতাগুলি ভূঁয়ে লুটে লুটে পড়ে
পালঙের শীষে শাকের চাকড়া আগাগোড়া আজ ভরে।
সন্ধ্যামণিতে আলো হয়ে আছে সারা আঙিনাটি ঐ,
আজ সংসারে সবি ভরপুর, হেন দিনে তুমি কই?

দুবেলা পাওনি পেট ভ’রে খেতে গিয়েছিল দেহ ভেঙে,
লুকিয়ে চোখের জল মুছে তুমি ভিক্ষা এনেছ মেঙে।
একমুঠো চাল চিবাতে চিবাতে রুইতে গিয়েছ চলি’,
উপোষ করিয়া রাত কাটায়েছ ক্ষুধা নাই মোরে বলি’।
দুপুরের তাতে বাদলের ছোটে খেটে খেটে দিনরাত,
মাঠে মাঠে ঘুরে কনকনে জাড়ে করেছ পরাণপাত।
সাঁঝের বেলায় হেঁটে হুঁটে এসে এলায়ে পড়েছ ঘুমে,
রাত্রি কাবার না হ’তে আবার চলেছ খোকারে চুমে।

বাকী খাজনার লাগি জমিদার দিয়েছে যাতনা কত,
মহাজন, দেনা সুদের জন্য গঞ্জনা দেছে শত।
চুপ করে সবি সয়েছ, আহা রে! দুটি হাত জোড় করে’
সকলের কাছে সময় নিয়েছ হাতে পায়ে ধ’রে প’ড়ে।
রোগে প’ড়ে থেকে সংসার নিয়ে কতই দিয়েছি জ্বালা,
ক্ষুধায় কাঁদিয়ে করেছে ছেলেরা কানদুটো ঝালাপালা।
যাতনা দুঃখ কত না সয়েছ তথাটি ছিল না মুখে
ফিরে এস আজ ঘরটি তোমার ভরিবে সোনার সুখে।

ঘনায়ে আসিছে সাঁঝের আঁধার নাহি মোর কোন’ কাজ
এ ঘর দুয়ারে পড়েনিক ঝাঁট জ্বলেনি এখনো সাঁজ।
চালের বাতায় ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো বুক চিরে চিরে ডাকে,
উঠিতে বসিতে টিকটিকি পড়ে যাটা দেওয়ালের ফাঁকে।
ঐখানে আহা পীঁড়ের উপর শুইতে গামছা পাতি’,
ঝুলিতেছে ঐ লাঠি, চোঙ, মই, মাথালী, তালের ছাতি।
ঘাটের ধারে বাঁশবন পানে সারারাত চেয়ে কাঁদি,
ঐখান হতে নিঠুর বাঁধনে লয়ে গেছে তোমা বাঁধি।

তেমনি পড়েগো কাল ছায়া ঐ ভরিয়া বকুল তল,
বৈকালে যেথা এলানো শরীরে চাহিতে ঠাণ্ডা জল!
সাঁজে ভোরে সেই পাখীগুলো ডাকে প্রাণ আনচান করে,
বেলা হয় তবু গোরুগুলো সব বাঁধা র’য়ে যায় ঘরে।
পথ চেয়ে হায় বসে থাকি ঠায়, জ্বলে না দুপুরে চুলো।
আপন ছেলেরো নাম ভুলে যাই মনটা হয়েছে ভুলো।
মালতী তোমার এসেছে ফিরিয়া শ্বশুরের ঘর থেকে,
খোকা যে তোমার হাঁটিতে শিখেছে; একবার যাও দেখে।

এত সব ফেলি জনমের মত চ’লে যাওয়া কিগো সাজে?
তবে কিগো তুমি ‘প্রবাস’ গিয়েছ আমাদেরই কোন’তাই কাজে?
বাবুদের আর গদাইপালের অত্যাচারের ভয়ে,
চ’লে গেলে কিগো মনের দুঃখে কিছুই না ব’লে ক’য়ে?
তাই যদি হয় ফিরে এস তুমি তোমারে সঙ্গে পেলে,
খোকারে লইয়া পালাই কোথাও ঘর সংসার ফেলে,
ভিক্ষা মাগিব, কাঠ কুড়াইব, ফিরিব না আর বাড়ী,
আঁচলের গিঁঠে বাঁধিয়া রাখিব তিলেক দিব না ছাড়ি’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10-5=? ( 5 )