পেন্সিলে করা বিদ্রোহ – কাজী নজরুল ইসলাম

পেন্সিলে করা বিদ্রোহ - কাজী নজরুল ইসলাম

কাজি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে প্রথম জ্ঞান লাভ করি সাধারণ জ্ঞানের বই এবং প্রথমিকে ”দুখু মিয়া” পড়ে। এরপর কবির কথা কথা যেখানেই পড়তাম  কল্পনায় এক লিচু চোর আর তার দুখী চেহারাটাই ফুটে উঠত। কাজি নজরুল ঠিকই জন্মেছিলেন দরিদ্র কিন্তু সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের এক কুঠারে। তার মা দরদি হৃদয়ে তাকে দুখু বলেই ডাকতেন। তৎকালীন বৃটিশ উপনিবেশ, হিন্দু জমিদারের অত্যাচার ও বাঙালী মুসলিমদের দুর্দশা দেখে শৈশবেই  কবির চেতনায় বিদ্রোহী ভাব জেগে উঠে। দারিদ্র্যতা গোছাতে চাচার হাত ধরে যোগদেন লেটো দলে সেখানে তৈরি হয় প্রতিযোগি মনোভাব। করেছেন রুটির দোকানের ৫ টাকা বেতনের চাকরি। কিশোর বয়সে গ্রামের মসজিদে দ্বায়িত্বরত ছিলেন ইমামতির মত মহান পেশায়। এ থেকে কবির ইসলামি মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়। আরবি ও ফারসি ভাষায়ও তিনি জ্ঞান লাভ করেন। এরপর যুদ্ধে যাবেন ঠিক করে যোগদেন বাঙালী পল্টনে।সেখানে এক হাফেজের সান্নিধ্যে ইসলামি মূল্যবোধ হয় আরো সমৃদ্ধ। আরবি ও ফারসি সাহিত্যের পরিচয় পাঠ মূলত তখনই ঘটেছিল।
কবির জীবনে। কবি সর্বদা অন্যায়,অত্যাচার, জুলুম,নিপীড়ন এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছে। এর একটি রূপ হলো বিদ্রোহী কবিতা।
বিদ্রোহী কবিতার রচনাকাল ও সময় নিয়ে বিস্তর তর্ক বির্তক রয়েছে।বিদ্রোহী কবিতা প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল সে বিষয়ে আজও দ্বন্দ্ব রয়েছে। নানা মতবিরোধ থাকলেও ধারণা করা হয় ১৯২২ সালের ৬ তারিখ “বিজলি” পত্রিকাতেই প্রথম ছাপা হয়েছিল। প্রথম প্রকাশের পাঠক জনপ্রিয়তা এমন ছিল যে সেদিন প্রবল বৃষ্টিতেও পত্রিকার সকল কপি শেষ  এর পর সাপ্তাহিক বিজলি সে সপ্তাহে দুবার ছাপানো হয়েছিল। প্রকাশ কালের বিতর্ক থাকলে এক অন্ধকার রাতে লন্ঠন জ্বালিয়ে কবি তার চিন্তার ভ্রূন পেন্সিলের* মাধ্যমে সাদা খাতায় বর্ণমালাগুলোকে গোলাবারুদের মত সাজিয়ে বিদ্রোহী কবিতা সৃষ্টি করেছেন সে ব্যাপারে নজরুলের সমসাময়িক সকলেই একমত ছিলেন।
(টিকা-বিদ্রোহী কবিতা লিখা হয়েছিল পেন্সিলে। বারবার কালিতে কলম ডুবিয়ে লিখতে গিয়ে কবি জোশ হারিয়ে ফেলবেন এই শঙ্কা থেকেই তিনি পেন্সিলের গাঁথুনিতে মাত্রাবৃত্ত মুক্তক ছন্দে শিরায় কাপন ধরা বিদ্রোহী কবিতা এক বসাতেই লিখে ছিলেন।)

কবিতাটি কোথায়, কখন রচিত হয়েছিল সে প্রসঙ্গে মুজফফর আহমেদ লিখেছেন, ‘এই ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর “বিদ্রোহী” কবিতা লিখেছিল। সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোন সময়ে তা আমি জানিনে। রাত ১০টার পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলেম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে তখন আমায় পড়ে শোনাল। “বিদ্রোহী” কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা।’

নজরুল গবেষক আহমেদ কবিরের দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯২০ সালে  উনপঞ্চাশ নাম্বার বাঙালী পল্টন ভেঙে দিলে নজরুল প্রথমে তার সতীর্থ শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে উঠেন এর কিছুদিন পর বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির  ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে উঠলেন। কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪ সি বাড়িটিতে রক্তে বিদ্রোহ জাগানীয়া  বিদ্রোহী কবিতাটি লিখেন।

কবিতাটি সেসময় মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পরে।স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ করেন। তবে বিদ্রোহী কবিতা জ্বালা ধরিয়েছিল নজরুল বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে।এই চক্রটি বিদ্রোহী কবিতাকে তো বটেই কাজি নজরুলকেও ব্যাঙ্গ করে।ওই সময় ‘শনিবারের চিঠি’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় নজরুলকে ব্যঙ্গ করে বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী কবিতার প্যারোডি লেখেন এবং সেগুলো ছাপেন। সজনীকান্ত দাসের বিদ্রোহী কবিতার প্যারোডি এমন, ‘আমি ব্যাঙ/লম্বা আমার ঠ্যাং/আমি ব্যাঙ/আমি সাপ, আমি ব্যাঙেরে গিলিয়া খাই/আমি বুক দিয়ে হাঁটি ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই।’ যোগানন্দ দাস লেখেন, ‘আমি বীর!/আমি দুর্জন, দুর্ধর্ষ, রুদ্র দীপ্ত শির/আমি বীর!’ অশোক চট্টোপাধ্যায় লেখেন, ‘ভাবী শ্বশুরের হিসাব খতিয়া/তরুণ বাঙ্গালী সাগর মথিয়া/উঠেছি যে আমি নিছক শুদ্ধক্ষীর/আমি বীর!’ আরও অনেকে এভাবেই বিদ্রোহী কবিতার সমালোচনা করেছেন। এমনকি কবি গোলাম মোস্তফাও তাঁর ‘নিয়ন্ত্রিত’ শিরোনামের কবিতায় কালজয়ী বিদ্রোহী কবিতাকে আঘাত হানার চেষ্টা করেছেন এভাবে, ‘ওগো ‘বিদ্রোহী’ বীর!/ সংযত কর, সংহত কর উন্নত তব শির/ তুই যদি ভাই বলিস চেচিয়ে- উন্নত মম শির,/ আমি বিদ্রোহী বীর,/ সে যে শুধুই প্রলাপ, শুধুই খেয়ায়, নাই নাই/ তার কোন গুণ,/ শুনি স্তম্ভিত হবে ‘নমরুদ’ আর ‘ফেরাউন’!’ কিন্তু সজনীকান্ত, গোলাম মোস্তফারা নজরুলের বিদ্রোহ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি।

এই কবিতাটির জন্য তাকে “কাফের কাজি” ট্যাগও দেয়া হয়েছিল।মূলত যারা এমনটা যারা করেছিল সেটা ছিল তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা। কারণ বিদ্রোহী কবিতা কাজি নজরুল ইসলামের কোরানিক জ্ঞানের এক অপরূপ বহিঃপ্রকাশ।  সাধারণ দৃষ্টিতে আসলে এর গভীরতা প্রকাশ পায়না।
আল্লাহ জিব্রাইল (আ.) এর মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ স. উপর যত ওহি নাযিল করেছেন তার সংকলিত রূপ হলো আল কুরআন। আল্লাহ বলেন কোরান যদি হযরত মুহাম্মদ স. ছাড়া অন্য কারো উপর নাযিল হতো তবে তা তৎক্ষনাৎ ধ্বংস হয়ে যেত। জিব্রাইল আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন ওহি নিয়ে আসত তখন তা নাযিলের প্রাক মুহূর্তে মুহাম্মদ স. অস্থির হয়ে পড়তেন।তাঁর শরীর কম্পিত হতো।তিনি জ্বরগ্রস্থের মত কম্বল জাড়াতেন পবিত্র দেহে। কম্বল মুড়ানো ব্যাক্তিকে আরবীতে বলা হয় মুজাম্মিল। আল্লাহ মহানবীকে এই নামে সম্মোধন করেছেন।এই নামে নাযিল কৃত সূরা মুযাম্মিল এর প্রথম আয়াত “ইয়া আইয়্যুহাল মুযাম্মিলু” অর্থ হে বস্ত্রাচ্ছাদিত। সূরা আলাকের প্রথম পাচটি আয়াত ওহি হিসাবে প্রথম নাজিল হয়। তার প্রথম আয়াত ছিল “ইক্বরা বিছমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক্ব” অর্থ “পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন”। তাছাড়া সূরা এখলাস,সূরা কাফেরূন,সূরা ফালাক্ব,সূরা নাস এর প্রথম আয়াত ” কুল” যার অর্থ “বলুন বা পড়ুন”। এই আদেশ স্বর্গীয়, অলৌকিক যা আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশিত।
বিদ্রোহী কবিতায় ” বল বীর” আদতে কবি সূরা আলাকের “ইক্বরা” অর্থাৎ পাঠ করুন বা কুল অর্থ বল ধরনের আজ্ঞা বা কতৃবাচ্যের বাগপ্রতিমায় উল্লেখ করেছেন।
সূরা আর রহমানের- “ফাবি আইয়্যি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান” রয়েছে ৩৩ বার।এত বার  আয়াতটি পুনঃরুক্ত হওয়া স্বত্বেও আয়াতটি বিব্রতকর বা বিরক্তিকর নয়। যার সরল অর্থ ” (আল্লাহর)  কোন নিয়ামতকে (নিদর্শনকে) অস্বীকার করবে?” বহুবার এই জিজ্ঞাসার তাৎপর্য হলো চাইলেই কেউ তা অস্বীকার করতে পারেন না।
এ বাকশৈলী বিদ্রোহী কবিতায়ও অনুস্মৃত। বিদ্রোহী কবিতায়ও  “আমি” শব্দটি রয়েছে ১৩৭ বার। এই আমি যদিও নজরুলের একার আমি বা আমিত্বকে প্রকাশ করেনা। এই আমি কখনো ক্ষেপা, কখনো বিদ্রোহী, কখনো বা মহান মানবের প্রতিচ্ছবি। বহুবার “আমি” শব্দটিও কবিতা পাঠে সামান্য বিরক্তেরও কারণ হয়নি।

তবে এমন শিল্পসিদ্ধ ব্যাবহার সকলে সমান চোখে নেয়নি।অনেকে করেছে এর অপব্যাখ্যা।

‌‌‌‌‌✏ “খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর”।
তার এই আমি পরম স্বত্তার বা অলৌকিক আয়না নূরে মুহাম্মাদের এক ঝলক। মেরাজের সময় সিদরাতুলমুনতাহা নামক মোকাম পর্যন্ত যেতে পেরেছিল ফেরেস্তা জিব্রাইল। এর পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাঁর ছিল না।কিন্তু হযরত মুহাম্মদ স. থামেননি। তিনি গিয়েছিলেন আরশ পর্যন্ত।

✏” আমি সহসা আমারে চিনেছি,আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাধ”।
মনসুর হাল্লাজের মতে তিনি  স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন। শরিয়তের ভাষায় “মান আরাফা নাফসাহু”।পূর্ণ ভাবে বললে,হাদীস শরীফে হুজুরে পাক ইরশাদ করেন, “ মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু” অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজেকে চিনেছে, সে ব্যক্তি আল্লাহ কে চিনেছে। নিজেকে চিনতে পারলেই আল্লাহ কে চিনতে পারা যায়। ক্বলবই হল আল্লাহর পরিচয় লাভের প্রধান উৎস। যাহারা বাতেনী আমলে নিরাকার সুপ্ত ক্বলবকে জাগ্রত করিয়া নিরাকার আল্লাহর আরশ বানাইতে পেরেছে, তাহাদের দিল কাবা হল আল্লাহর আরশ। তাই হাদিস শরীফে উল্লেখ রয়েছে,“ কুলুবুল মুমিনিনা আরশোল্লাহ” অর্থ্যাৎ মুমিনগণের ক্বলব আল্লাহর আরশ।

কোরআনে ৮২ বার সালাত এবং বহুবার জাকাতের কথা স্মরণ করিয়ে আল্লাহ আদম সন্তানকে যেন সতর্ক করেছে বহুবার।  কবিও ” বল বীর”, ”আমি” শ্বব্দের সঠিক সাহিত্যিক প্রয়োগ তার কোরআনের জ্ঞানের সঠিক উপস্থাপন।

বলাহয় কবিতা একটি সাজানো বাগানের ফুল আর কবি নানা কৌশলে সে ফুল ফুটিয়ে তুলে। ২০২১ সালে বিদ্রোহী কবিতার বয়স হতে চলল ◀১০০▶ বছর। এই শতবর্ষের দারপ্রান্তে এসেও কবিতাটি পাঠের আবেদন এতটুকুও কমেনি। এ কবিটাতি নজরুলমানস ও তার প্রতিভার নানা বৈশিষ্ট্য ও দিক ফুটিয়ে তুলে। কবির অসাধারণ বাকভঙ্গিমা,শব্দচয়ন, অলঙ্কার জ্ঞান,অসাম্প্রদায়িক চেতনা,কোরানের সঠিক শিল্পসিদ্ধ ব্যাবহার, বিশ্বমানবিক চেতনা,আরবি-ফারসিসহ বিদেশী শব্দের সফল প্রয়োগ পঠনে বিদ্রোহের অভয়ব তৈরীর এক অপূর্ব মুনশিয়ানা।
কবিতার আবৃত্তি সাধারণত হয় সহজ থেকে কঠিন কিন্তু বিদ্রোহী কবিতা প্রচলিত ধারা ভেঙে প্রথমেই দিয়েছে বড় ধাক্কা(Big push)-
“বল বীর/ বল উন্নত মম শির”।
এই বাকরীতি ও শৈলীর নানা রকম ব্যাখা সমালোচকেরা দিয়েছেন। এতকিছুর পরেও তাকে ” কাফের কাজি” ট্যাগ দেয়া হয়।কিন্তু সেসব সমালোচকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিদ্রোহী কবিতা যেন শতবছরে এসেও বলছে-
আমি চির বিদ্রোহী বীর-বিশ্ব ছাড়িয়া উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির।

তথ্যসূত্র –
১। কাজি নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথা- মোজাফফর আহমদ
২। দুখু মিয়ার গল্প- শান্তা মারিয়া
৩।দৈনিক সংগ্রাম -নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা
৪।দ্য ডেয়লি স্টার-‘বিদ্রোহী’ কবিতার আঁতুড়ঘর
৫।বাংলাদেশ প্রতিদিন
৬।যুগান্তর -বিদ্রোহী কবিতা ওহির অনুরূপ বাকভঙ্গি
৭। অন্যান্য বইয়ের নির্বাচিত কিছু অংশ।

(আমার পাঠ পরিসর সীমিত। অজ্ঞতা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)

Published by

Junaid Jabed Nihal

I'm still workin' on my Masterpiece

One thought on “পেন্সিলে করা বিদ্রোহ – কাজী নজরুল ইসলাম”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10-5=? ( 5 )