বাংলার নবজাগরণ ও তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদান বর্ণনা

Assignment for class 8: বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়

বাংলার নবজাগরণ ও তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবদান বর্ণনা।

আঠারাে শতকের শেষার্ধে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব এবং ফ্রান্সে রক্তক্ষয়ী ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি:) প্রভাবএসে পড়ে এ অঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। এ সময়ে বাংলার কিছু সংখ্যক ব্যক্তি এই বৈপ্লবিকপরিবর্তনের সংস্পর্শে আসেন। তারাই বাংলায় ‘রেনেসাস বা নবজাগরণের সূচনা করেন। এই সময়েবাংলায় প্রচলিত ধৰ্ম্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য, সমাজ রীতি-নীতি ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের চিন্তারবিপ্লব সূচিত হয়। বাংলার সর্ব ক্ষেত্রে দেখা দেয় পরিবর্তনের বিরাট সম্ভাবনা, যা ইঙ্গিত করে একনবযুগের। এই নবযুগের জন্ম দিয়েছিলেন বাংলার একদল শিক্ষিত তরুণ যাদের নেতৃত্বে ছিলেন রাজারামমােহন রায়, ডিরােজিও, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ।তাঁদের নেতৃত্বের প্রভাবে দেশবাসীর মধ্যে আত্মসচেতনতা, আত্মমর্যাদাবােধ ও স্বাতন্তু বাধ তীব্রভাবেজাগ্রত হতে থাকে। নবজাগরণের প্রভাবেই দেশবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রাথমিক ভিত রচিতহয়, যা শেষ পর্যন্ত বাঙালিকে তথা ভারতীয়দের স্বাধীনতার পথে ঠেলে দেয়।রাজা রামমােহন রায়আঠারাে শতকে ইউরােপীয় ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে বাংলায় যে নবজাগরণ বা ‘রেনেসাসের জন্ম হয়,পরবর্তিকালে সেই ভাবধারা সারা ভারতবর্ষে ছাড়িয়ে গড়ে। এর ফলে শুধু বাংলা না সারা ভারতবর্ষেরআর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিশাল পরিবর্তন সূচিত হয়। যার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব, বাংলার ইংরেজিশিক্ষায় শিক্ষিত, ইউরােপীয় আধুনিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত বাঙালি সন্তানরা। তাঁদের মধ্যে প্রথম আধুনিকপুরুষ ছিলেন রাজা রামমােহন রায়। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার আচ্ছন্ন সমাজ, পশ্চাদমুখিশিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাঙালি সমাজকে আধুনিক যুগের পথে এগিয়ে দেন। তাঁর সময়টাইবাংলার ইতিহাসে নবজাগরণ বা “রেনেসাঁসের যুগ নামে পরিচিত।ডিরােজিও ও ইয়াং বেঙ্গল মুভমেন্ট:উনিশ শতকের প্র মাধ’ জুড়ে ছিল রাজা রামমােহন রায়ের আন্দোলনের ধারা । দৃঢ়ভাবে সে ধারাকেবাঁচিয়ে রেখেছিল হিন্দু কলেজের প্রতিভাবান ছাত্রবৃন্দ ইয়াং বেঙ্গল আন্দোলনের মাধ্যমে। যার নেতৃত্বেছিলেন হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরি লুইস ডিরােজিও।

তিনি তাঁর ছাত্র-অনুসারীদের স্বাধীনমতামত ব্যক্ত করার শিক্ষা দেন। রেনেসাঁস’ যুগে বাঙালি যুব সমাজের মধ্যে আলােড়ন সৃষ্টিকারী ‘ইয়াংবেঙ্গল আন্দোলনের প্রবক্তা ডিরােজিও ১৮০৯ খিস্ট্রাব্দে কলকাতা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। ডিরােজিওতার স্কুল শিক্ষক ডেভিড ড্রামন্ডের প্রগতিবাদী, সংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমৃদ্ধ মানবতাবাদীচিন্তাধারা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। শিশুকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই শিক্ষকের আদর্শ ধারণ করেরাখার কারণে হতে পেরেছিলেন রাজা রামমােহন রায়ের যােগ্য উত্তরসূরি। বয়সে তরুণ হলেও তিনিইতিহাস, ইংরেজি, সাহিত্য, দর্শন শাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর:বাঙালিদের মধ্যে নতুন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবাদর্শ সৃষ্টিতে যারা অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছেনঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন রাজা রামমােহন রায়ের যােগ্য উত্তরসুরি ।

একজন সংস্কৃত পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও জনহিতৈষী। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একদিকে পচন্দ্র বিদ্যাসাগরবাঙালিদের মধ্যে নতুন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবাদর্শ সৃষ্টিতে যারা অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছেনঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন রাজা রামমােহন রায়ের যােগ্য উত্তরসূরি ।একজন সংস্কৃত পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও জনহিতৈষী। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একদিকেছিলেন বিদ্যাসাগর অপর দিকে দয়ার সাগর। তাঁর মানবিক গুণাবলি তাঁর পান্ডিত্যের মতই বাঙালিসমাজে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বাংলার শিক্ষা ও সামাজিক নবজাগরণ ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্যগুরুত্ববহ।নওয়াব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী:উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমান তথা ভারতীয় মুসলমান জনগােষ্ঠি শিক্ষাদীক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে ছিল।

পশ্চাদপদ। চরম দুর্দশাগ্রস্ত এই জনগােষ্ঠি চলমান অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সকল কর্মকাণ্ড থেকে ছিলদূরে। দুর্দশা কবলিত পশ্চাদপদ মুসলিম সমাজকে সহযােগিতা করতে যেসব মনীষী এগিয়ে আসেনতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নওয়াব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী। এই দুই মনীষীর প্রচেষ্টায়বাঙালি মুসলমান পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ এবং ইংরেজদের সঙ্গে সহযােগিতা করার বিষয়ে উৎসাহিত হয়।বাঙালি মুসলিম রেনেসাঁসের অগ্রপথিকদ্বয় যেমন মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার পক্ষপাতি ছিলেন তেমনআমীর আলী তাদের রাজনীতি সচেতন করারও পক্ষে ছিলেন। তাদের প্রভাবে প্রেরণায় মুসলমানদেরমধ্যে সৃষ্টি হয় এক নবচেতনার ও জাগরণের।বেগম রােকেয়াবাঙালি মুসলিম নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রােকেয়া ছােট বেলা থেকেই নারীকে পর্দা প্রথার নামেবন্দি করে রেখে তার ব্যক্তিত্বের প্রতি অবমাননা তাকে তীব্রভাবে আঘাত করেছে। ধর্মের নামে এইআচরণের ফলে মেয়েরা সব ধরনের সুযােগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। এমনকি লেখা পড়া করাও তাদেরজন্য নিষিদ্ধ ছিল।

তিনি বাঙালি মুসলমান নারী সমাজকে এই দুর্দশা থেকে উদ্ধার করেন। বড় ভাই বােনএবং পরে স্বামীর সহযােগিতায় লেখা পড়া শিখে নারী সমাজকে শিক্ষার আলােয় আলােকিত করেন।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নারী শিক্ষা নারী জাগরণের জন্য কাজ করে গেছেন। বাঙালি মুসলমান নারীসমাজ তাঁদের আজকের প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁর কাছে চির কৃতজ্ঞ এবং ঋণী, তিনি বেগম রােকেয়া।তাছাড়া, বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেরবিকাশ ঘটে। বাংলা সাহিত্যে মীর মশাররফ হােসেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজীনজরুল ইসলামের অবদানও ব্যাপক। তাদের অবদানের কারণে আজ বাঙালি জাতি বিশ্বেরদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে।

Published by

QnApedia

Admin @ QnApedia

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10-5=? ( 5 )